এটা একটা ঘুমে পাওয়া গল্প; স্বপ্নে পাওয়া বলতে চাই না। কারণ, সে রাতে আমি ঘুম আর স্বপ্নের মাঝামাঝি একটা অস্পষ্ট চৈতন্যের ভেতরে ছিলাম। শুইয়ে রাখা মইয়ের মতো একটা টানা রেলপথ দেখেছিলাম; কিছুদূর গিয়েই ওটা আচমকা বাঁক নিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল দৃষ্টিসীমার বাইরে। রেলপথটার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল নানা বাহারি রঙের পাথর। ওগুলো দেখতে অনেকটা ছেলেবেলার লাল-নীল-সবুজ গোল গোল চুইংগাম বলের মতো, আমরা বলতাম টিকটিকির ডিম।
চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম আমি দাঁড়িয়ে আছি একটা ছোট্ট রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। চারপাশে নানা বয়েসি মানুষের ভিড়; কেউ বসে আছে সিমেন্টের বেঞ্চে, কেউবা দাঁড়িয়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তাদের কথাবার্তার বিচ্ছিন্ন টুকরো থেকে যা বুঝলাম তা হলো, এরা সবাই অপেক্ষা করে আছে একটা ট্রেনের জন্য। প্ল্যাটফর্মে তা সেটাই স্বাভাবিক। তবে এই ট্রেনটা কোনো সাধারণ ট্রেন নয়; এর নাম ‘ড্রিমট্রেন’। কেউ কেউ আবার দেখলাম একে ‘স্বপ্নট্রেন’ বলেও ডাকছে। এই ‘ড্রিমট্রেন’ বা ‘স্বপ্নট্রেন’ এদের সবাইকে নিয়ে যাবে কোনো এক ‘স্বপ্ননগরী’তে-যা কোথায় বা সেখানে কী আছে এসব কেউ জানে না জানতে চায়ও না। সবাই শুধু সেখানে যেতে চায়।
ছাড়ার নির্ধারিত সময়ের পর ঘণ্টাখানেক পার হয়ে গেলেও ‘স্বপ্নট্রেনে’র দেখা নেই। আশেপাশের অপেক্ষমাণ যাত্রীদের বিরক্তির প্রকাশটা চাপা গুঞ্জন থেকে ধীরে ধীরে উচ্চকিত অভিযোগে পাল্টে যেতে থাকে। প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি জায়গায় একজন স্থূলকায় প্রৌঢ় ভদ্রলোককে দেখা গেল। তার সাথে ছিপছিপে এক তরুণী (সম্ভবত তার স্ত্রী) দাঁড়িয়ে। তরুণীটি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলেও, ভদ্রলোকটি পায়চারি করছিলেন; কিছুটা অস্থিরভাবে। লাল পোলো টি-শার্ট আর সাদা ক্যাপ পরা লোকটাকে দেখতে লাগছিল অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় শৌখিন পর্যটকের মতো। আর মাল্টি কালার স্ট্রাইপড সামার ড্রেস আর ক্রিম সান-হ্যাট পরিহিত তরুণীকে দেখাচ্ছিল সেভেনটিসের হলিউড অভিনেত্রীদের মতো। বিরক্তিতে ফোঁস ফোঁস করছিলেন ভদ্রলোক যার তালে তালে তার তরমুজ-সদৃশ ভুঁড়িটি বেশ ছান্দসিক গতিময়তার সাথে ওঠানামা করছিল। তরুণীর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,
‘এই তাহলে সেই বিখ্যাত ট্রেনের অবস্থা? আহ্লাদ করে আবার ‘ড্রিমট্রেন’ ডাকা হচ্ছে! ড্রিমট্রেন অর মাই ফুট! দেরি যে হচ্ছে একটা অ্যানাউন্সমেন্ট পর্যন্ত নেই।’
‘ঝামেলায় আমরা সবাই পড়েছি। হইচই করলে কি এর কোনো সমাধান হবে?’ তরুণীর গলা বেশ নির্লিপ্ত।
‘ওকে ফাইন, তাহলে আসো বুদ্ধা স্টাইলে ধ্যান করি। নির্ভানাতে পৌঁছাতে না পারলেও অ্যাট লিস্ট ট্রেনটাকে তাড়াতাড়ি আনার ব্যবস্থা করা যাবে ফর শিওর।’
তরুণী বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে উল্টোদিকে ট্রেন-লাইনের দিকে তাকাল। ট্রেন-লাইনটা দেখে মনে হচ্ছিল কেউ যেন মই উঁচিয়ে আকাশে উঠতে গিয়ে তাল হারিয়ে নিচে পড়ে গিয়েছে। যাত্রীদের সবার কল্পনায় তখন একটাই দৃশ্যকু ঝিকঝিক করতে করতে একরাশ ধোঁয়া তুলে প্ল্যাটফর্মের ভেতরে ঢুকছে ড্রিমট্রেন যার ভারী কালো ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে প্ল্যাটফর্মের একাংশ। তবে বাস্তবতা হলো যাত্রীদের সবাই চোখে ও ভ্রুতে একই মাত্রা ও মাপের বিরক্তি নিয়ে তখনো দাঁড়িয়ে; অ্যাসেম্বলি লাইন প্রোডাকশান কর্মীদের একটা বড়ো দল যেন।
যেদিকে তাকিয়ে ছিলাম তার বিপরীত দিক থেকে কারো একজনের হেঁটে আসার শব্দ শুনলাম। মুখ ঘুরিয়ে দেখলাম অস্বাভাবিক লম্বা একটা লোক। যে কুর্নিশটা সে আমাকে করল সেটা আরো লম্ব^া। পরনে ঢোলা রাম্পার স্যুট, মাথায় রঙিন কোঁকড়ানো চুল, ফরমালিন দেওয়া চকচকে আপেলের চামড়া রঙের পাতলা ঠোঁট, চেরিফলের নিখুঁত জ্যামিতিক সুগোলতায় আঁকা সার্কাসের ভাঁড়ের নাক, গালের ওপর একটা পোলকা ডটেড টোল। মুখে বিস্তৃত একটা হাসি ছড়িয়ে লোকটা বলল,
‘ডিরিম টেরেনে উঠোনের আগে একটা স্বপ্নবরি লইয়া যান, জনাব! দাম মাত্র দশ ট্যাকা, দশ ট্যাকা, দশ ট্যাকা!’
‘স্বপ্নবড়ি মানে?’
‘আপনে তো কবি। কবিতা লিখতে পারতেসেন না কয়েক দিন ধইরা, চিন্তার কিস্সু নাই, জনাব। লইয়া যান আমার একখান স্বপ্নবরি, কবিতা বাইর হইব তুফানের মতো, ঝরের মতো, সেলাইকোলনের মতো। আকাশের পানি মানে বিষ্টি দিয়া খাইলে উপকার পাইবেন বেশি। হেইডাও আমি দিয়া দিমু লগে। বরির লগে পানি ফিরি।’
বেশ অবাক হলাম। আমার কবিতা লেখার ব্যাপারটা এই ভাঁড় জানল কীভাবে? বিস্ময় চেপে বললাম,
‘কেনার প্রশ্ন তো পরে। স্বপ্নবড়ি জিনিসটা কী সেটা আগে জানা দরকার। এর সাথে কবিতার-ই বা কী সম্পর্ক?
‘জনাব এইডা এক্কেরে খাটি জিনিস। কাচা চান্দের নূর আর তেরো রকম ওষধি ফুলের বাস দিয়া তৈয়ার হইসে এই বরি। কারিগর আমি নিজেই। অন্য কুনোহানেই পাইবেন না এইডা। আমি সবের ধারে এই জিনিস বেচিও না। মানুষ বুইজঝা বেচি। একটা লইয়া খাইয়া দ্যাহেন, ঠকতেন না। পাগল হইয়া খুঁজবেন আবার।’
‘কী বললেন? চাঁদের আলো আর ফুলের গন্ধ দিয়ে তৈরি এই বড়ি? ফাজলামি করেন?’
‘জি না জনাব, ফাইজলামি করি না। আপনে তো কবি। চিন্তা কইরা দ্যাখেন আপনে যদি শব্দ দিয়া কবিতা ল্যাখতে পারেন আর হেইডারে বই বানাইয়া বাজারে ব্যাচতে পারেন, তাইলে আমি চান্দের আলো আর ফুলের বাস দিয়া বরি বানাইয়া বেচতে পারুম না ক্যান?
‘কারণ আপনার ব্যবহার করা ম্যাটেরিয়াল বা কাঁচামাল অ্যাবস্ট্রাক্ট মানে বিমূর্ত, ধরা-ছোঁয়া যায় না।’
‘শব্দও তো জনাব একোই ব্যাপার। শব্দর গায়ে কেউ হাত বুলাইয়া দিসে, না ধইরা কচকচ কইরা খাইসে কুনোদিন হুনছেন?’
ভীষণ ভড়কে গেলাম। এই ভাঁড়ের যুক্তি অকাট্য। ‘চাঁদের আলো’, ‘ফুলের গন্ধ’, ‘শব্দ’ এগুলো বিমূর্ত-ই বটে। ঠিক যেমন শব্দও বিমূর্ত। শেষেরটাকে যদি কাগজে ধরা যায় তাহলে প্রথম দুটোকে বড়িতে ধরতে না পারার তো আসলেই কোনো কারণ নেই।
হোলি কাউ! এই ব্যাটা তো ছদ্মবেশী জাদুকর!
বিস্ময় চেপে ঘোড়েল ক্রেতার মতো বললাম,
‘কী আবোল-তাবোল বলেন এইসব! যাই হোক, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। দশ টাকা অনেক বেশি। পাঁচ টাকায় হলে…।’
‘দামাদামি নাই, জনাব। এক দাম। এই জিনিস আপনে হাজার টাকায়ও অন্য কুনোহানে পাইবেন না’মুখ শক্ত করে বলে স্বপ্নবড়িওয়ালা।
দাম মিটিয়ে বড়িটা এদিক ওদিক উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলাম। জিনিসটা দেখতে দারুণ, অনেকটা রাস্তার ধারে বিক্রি করা ৩-৪ দানার বড়ো বার্মিজ বাদামের মতো। বাইরের দিকটা ধাতব তবে, রংটা মেটে। কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে মাঝখানে চাপ দিতেই ‘ট্রিপ’ শব্দ করে দুই পাশে সরে গেল ধাতব খোসাটা। ভেতরে ডালিম-দানা রঙা দুটো হৃদয়াকৃতির জিনিস। দেখতে অনেকটা আংটিতে বসানো দামি পাথরের মতো।
খাওয়ার নিয়মাবলি জানতে মুখ তুলে খুঁজলাম বড়িওয়ালাকে। চারপাশে প্রচুর মানুষ। কিন্তু বড়িওয়ালাকে কোথাও দেখা গেল না। সে যেন ভোজবাজির মতো অদৃশ্য হয়ে গেছে। হঠাৎ চোখ পড়ল আমার ব্যাগের পাশেই রাখা একটা অদ্ভুত কাঠের বোতলের দিকে; বেগুনি রঙের সাইনপেন দিয়ে ওটার ওপর গোটা গোটা অক্ষরে নির্ভুল বানানে লেখা ‘বিশুদ্ধ বৃষ্টিজল’। চকিতে মনে পড়ে গেল যে বড়িওয়ালা আমাকে বড়িটা বৃষ্টির পানি দিয়ে খেতে বলেছিল। এও বলেছিল যে বড়ি কিনলে পানি ফ্রি। তার মানে এই কাঠের বোতলটা বড়িওয়ালাই রেখে গিয়েছে।
আর ঠিক এইসময় ঝকঝক শব্দ তুলে স্টেশনে ঢুকল ড্রিমট্রেন। ভেতরটা পুরোই খালি। তাই ভেতর থেকে যাত্রী নামার কোনো ব্যাপার ছিল না। ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে পুরোপুরি থামার আগেই যাত্রীরা গাট্টি-বোঁচকা নিয়ে ট্রেনে ওঠার জন্য রীতিমতো ধুন্ধুমার বাধিয়ে দেয়।
তবে ট্রেনটাকে দেখে কিন্তু মোটেও দূরপাল্লার ট্রেন বলে মনে হচ্ছিল না; বরং অনেকটা চারপাশ খোলা শিশু পার্কের রাইডিং ট্রেনগুলোর মতো দেখতে। কোনো নির্দিষ্ট ওঠার বা নামার জায়গা ছিল না। যেন পুরো স্টেশন চক্রাকারে ঘুরে একটু পরেই আবার প্ল্যাটফর্মে ফিরে আসবে।
হঠাৎ দেখলাম প্রৌঢ় ভদ্রলোকের সাথে থাকা সেই তরুণী আমার দিকে এগিয়ে আসছে; কাছে এসে খুব সাবলীল ভঙ্গিতে বলল,
‘আপনি কি ড্রিমট্রেনের যাত্রী?’
আমি কিছু বলার আগেই তরুণী বেশ নরম স্বরে বলল, ‘আপনি প্লিজ আমার হাজবেন্ডের পাশের সিটে বসবেন। সিট রাখা আছে।’
‘কিন্তু কেন? আর তাছাড়া আপনি তাহলে বসবেন কোথায়?’
‘আমি আসলে যাচ্ছি না। তবে এই খবরটা ও এখনো জানে না।’
কথোপকথনের এই পর্যায়ে বাতাস ফুঁড়ে সহসাই এক যুবকের আবির্ভাব; দীর্ঘ গড়নের সুঠামদেহী এক পুরুষ। সে এসেই তরুণীটিকে তাড়া দিলো, ‘কী হলো চল! আমার উইন্ড-কার দারায়া আছে। ড্রাইভার তারা দিতেসে। ভাড়ার গাড়ি তো!’
তরুণী যুবকটিকে দেখিয়ে বলল, ‘আমি ওর সাথে আকাশের ঐপারের একটা স্টেশনে চলে যাচ্ছি। বুড়া ভামটা আমাকে টাকার জোরে বিয়ে করেছিল। আমিও রাজি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম বাকি জীবনটা স্বাচ্ছন্দ্যেই কেটে যাবে, ছোটোবেলায় রোড অ্যাক্সিডেন্টে বাবা-মা মারা যাওয়ার পর বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে লাথি-ঝাঁটা খেয়ে মানুষ হয়েছি। তাই একটা সচ্ছল জীবনের স্বপ্ন ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু বুড়োটার সাথে সংসার শুরু করার কিছুদিন পরেই বুঝলাম যে জীবনে টাকার দরকার আছে ঠিক-ই, তবে শুধু টাকার জন্য একটা আধমরা ভামের সাথে গোটা একটা জীবন কাটানো যায় না। বেঁচে থাকার জন্য একজন ভালো সঙ্গী চাই। আর তাছাড়া এই বুড়োটা খুব তাড়াতাড়ি মরবেও না, কারণ তার বড়ো কোনো অসুখ নেই।’
এসময় ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠলে হাত ধরাধরি করে চলে যায় পরকীয়া যুগল। আমি মুখ ঘুরিয়ে ট্রেনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম প্রৌঢ় ভদ্রলোক ট্রেনে তার সিট থেকে উঠে উদ্বিগ্ন মুখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। নিশ্চয়ই স্ত্রীকে খুঁজছেন। আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম। লোকটার জন্য আমার ভেতরে করুণা, মমতা, রাগ আর দীর্ঘশ্বাসের মিশেলে অদ্ভুত এক অনুভূতির যৌগ তৈরি হচ্ছে। কী বোকা! ভেবেছে টাকা দিয়ে সুন্দরী বৌ কিনে নেবে! আর তরুণীটিই বা কেমন! বলে কয়ে সব চুকিয়ে গেলেই তো হতো! এভাবে পালানোর কী দরকার ছিল? আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে ভদ্রলোকের পাশে বসব না। শুধু তাই না, এই ট্রেনেই আর উঠব না। ড্রিমট্রেন না হাতি! আর ঠিক তখনই মৃদু দুলে উঠল ট্রেনটা।
যাত্রীদের মধ্যে একটা হুল্লোড় ছড়িয়ে পড়ল। শেষ পর্যন্ত স্বপ্ননগরীর উদ্দেশে স্টেশন ছাড়তে যাচ্ছে বহুল-প্রতীক্ষিত ড্রিমট্রেন। তবে এই উত্তেজনার সাথে একটা অজানা আশঙ্কার ছায়াও দেখা যাচ্ছে কারও কারও চোখে-মুখে। স্বপ্ননগরী তার স্বপ্নময়তা আর অচিনপুরীয় ছমছমতা নিয়ে যেন অপেক্ষা করে আছে উৎসুক ও একই সাথে কিছুটা শঙ্কিত এই অভিযাত্রীদের জন্য।
এদিকে আমি শেষপর্যন্ত ঠিক কেন ট্রেনটায় উঠলাম না সেটা নিজের কাছে পরিষ্কার করতে পারলাম না; একটা অস্পষ্ট অস্বস্তি নিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে পায়চারি শুরু লাগলাম প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি জায়গাটায়। সব যাত্রী ট্রেনে উঠে পড়ার পর একটা খালি সিমেন্টের বেঞ্চে বসে পড়লাম। কাঠের বোতলটা থেকে গলায় পানি ঢেলে দুটো বড়ি একসাথে ছুড়ে দিলাম মুখের ভেতর। মুহূর্তেই ঝিক্ করে উঠল মাথাটা। মনে হলো ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি কোনো চৈতন্য থেকে একটা অচেনা ঘোরের ভেতর গড়িয়ে পড়লাম।
ধূসর ছায়াপথ-রঙা আলোয় দেখলাম হাল্কা সোনালী আলোর ভেতরে ছোটো ছোটো লুডুর ছক্কার মতো কিছু জিনিস ভাসতে ভাসতে এঁকেবেঁকে সামনের দিকে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বুঝলাম যে ওগুলো শব্দ। তবে অনেকক্ষণ চেয়ে থেকেও একটা শব্দও পড়তে পারলাম না। কোথা থেকে যেন একটা অচেনা ফুলের ঘ্রাণ ভেসে এলো। গন্ধের উৎস খুঁজতে আশেপাশে তাকাতে গিয়ে বুঝলাম যে শূন্যে দাঁড়িয়ে আছি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো নিজেকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে আমি হাঁচর-পাঁচর করে কিছু ধরার চেষ্টা করছিলাম না, বরং বেশ অভ্যস্ত একটা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম শূন্যের ওপর।
একসময় আবিষ্কার করলাম যে শব্দগুলো বেরিয়ে আসছে আমারই শরীরের নানা অলিগলি থেকে : নখের নিচ, কানের ছিদ্র, চোখের কোণ, এমনকি নাভির গভীর থেকে। মনে হলো শব্দগুলো যেন হাওয়ায় বাক্য আঁকতে চেষ্টা করছে। সেসব বাক্যের যেমন বাহারি রং তেমনি ভিন্ন ভিন্ন মেজাজ : বাদামি অভিমানী বাক্য, শুভ্র প্রশান্ত বাক্য, লাল যৌবন-থরথর বাক্য, নীল কাম-ঘর্মাক্ত বাক্য, বেগুনি প্রতারক বাক্য ইত্যাকার আরও কত প্রকার যে ছিল তা এখন আর মনে নেই। এরা যেন বহুদিন আমার শরীরে বন্দি থাকার পর ছাড়া পেয়ে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে একে একে, পরস্পরের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে। তবে শব্দগুলো বেরিয়ে যাবার পর বেশ হাল্কা লাগছিল নিজেকে, একটা অভাবিত ভারমুক্তির স্বস্তি আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছিল পুরো শরীরে।
এসময় হঠাৎ-ই মনে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্বের ক্লাসে পড়া সুইস ভাষাবিদ ফার্ডিন্যান্ড ডি সস্যুরের ফর্ম-সাব্সটেন্স তত্ত্বের কথা। তিনি বলেছেন যে ভাষা শুধুই একটা ফর্ম যার ভেতরে কোনো সাব্সটেন্স বা পদার্থ নেই। দাবাখেলার গুটির উপমা দিয়ে তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে দাবার যে-কোনো গুটি, যেমন রাজা বা মন্ত্রী, সোনা, রূপা, পেতল, বাঁশ, প্লাস্টিক, পাথর বা অন্য যা কিছু দিয়েই তৈরি হোক না কেন তাতে তাদের দাবার বোর্ডে চলাচলের নিয়মে কোনো পরিবর্তন হয় না। যেমন ধরা যাক একটা পেতলের রাজাকে সরিয়ে যদি সোনার রাজা বসানো হয় তাতে রাজার বোর্ডে চলাচলের নিয়ম একই থাকবে, চারদিকে সে যেতে পারবে শুধু ঐ এক ঘরই।
ঠিক সেরকমই ভাষা শুধুই একটা বাহ্য আকার বা ফর্ম, তা শ্র“ত, কথিত বা লিখিত যেভাবেই ধরা থাক না কেন। ফর্মের এই ভিন্নতার কারণে ভাষার অন্তঃস্থ বিমূর্ত নিয়ম-কানুনগুলোর কোনো পরিবর্তন হয় না। তাই ভাষাকে বুঝতে হবে এর বাহ্য আকার বা ফর্ম দিয়েই, অন্তঃস্থ বিমূর্ত সারবস্তু দিয়ে নয়।
ভাষাকে ধরাছোঁয়া যায় না অথচ এই ধরাছোঁয়ার জগতের প্রায় প্রতিটি বস্তু/অবস্তুকে ভাষার ধ্বনিতে-শব্দে-বাক্যে ধরা যায় বা অন্তত ধরার চেষ্টা করা যায়। অর্থাৎ অবস্তু ধারণ করছে বস্তুকে। আমার মনে পড়ে যায় স্বপ্নবড়িওয়ালার সেই জাদুকরী তুলনা, যদি বিমূর্ত শব্দে কবিতা লিখে তাকে কাগজে মূর্ত করে বাজারে বিক্রি করা যায়, তাহলে একটা মূর্ত স্বপ্নবড়ি কেন বিমূর্ত কবিতা তৈরি করতে পারবে না?
সামনের শূন্যে বয়ে যাওয়া বাক্যগুলো ভাসতে ভাসতে এক সময় বহুদূরে চলে যায়। ওদেরকে কিছুদূর অনুসরণ করে দেখলাম যে বাক্যগুলো থেকে আস্তে আস্তে লতিয়ে উঠছে দুটো মানব শরীর। একসময় অবয়ব দুটো সম্পূর্ণ হলে চিনতে পারলাম ওদের, ড্রিমট্রেনের সেই প্রৌঢ় ভদ্রলোকের তরুণী স্ত্রী আর তার প্রেমিক। তারা কথা বলছিল পরস্পরের সঙ্গে, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। দুজনেরই শরীরের ভেতরটা দেখতে পাচ্ছিলাম পরিষ্কার, শব্দগুলোর মধ্যে এবার বেশ কয়েকটাকে পড়তেও পারছিলাম। তবে যে শব্দগুলো তাদের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছিল আর যেগুলো তাদের শরীর-বন্দি হয়েছিল এদের অর্থ ও প্রকৃতি চমকে ওঠার মতোই আলাদা। মুখে তারা বলছিল ‘ভালোবাসা’, ‘সুখ’, ‘পরিত্রাণ’, ‘আনন্দ’ আর ভেতরে বন্দি শব্দগুলোর মধ্যে যেগুলো পড়া যাচ্ছিল সেগুলোর কয়েকটা হলো ‘দীর্ঘশ্বাস’, ‘ঘৃণা’, ‘অতৃপ্তি’ ও ‘বিনাশ’।
২
এ পর্যায়ে আমার তন্দ্রা কিংবা অচেনা চৈতন্যের ঘোরটা টকে যাওয়া দুধের মতো ফেটে যায়। চোখ খুলে দেখলাম যে নিজের শোবার ঘরে শুয়ে আছি। আমি একাই থাকি, ছোট্ট একটা ভাড়া বাসায়। অধ্যাপনা করি কাছেই একটা প্রাইভেট কলেজে। বয়স চল্লিশের মাঝামাঝি তবে এখনো বিয়ে করিনি, শীঘ্রই তেমন কোনো সম্ভাবনাও নেই। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি একটা মেঘলা বিকেল সন্ধ্যার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ-ই ডোরবেল বেজে ওঠে। কাজের ছেলেটা এসে বলল যে আমার সাথে একজন দেখা করতে এসেছে। বসার ঘরে গিয়ে দেখি ধোপদুরস্ত পোশাকের মাঝবয়েসি সুদর্শন এক পুরুষ। মাথার চুল কিছুটা পাতলা; পুরু গোঁফের কারণে মুখের প্রায় অর্ধেকই ঢেকে আছে। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে মাথাটা আলতো সামনে ঝুঁকিয়ে বললেন,
‘আপনাকে অসময়ে বিরক্ত করার জন্য খুবই লজ্জিত। আমি আপনার একজন পাঠক। আপনার একটা কবিতা বিষয়ে কিছু কথা বলেই চলে যাব।’
‘না না, ঠিক আছে। আপনি বসুন, প্লিজ।’
‘ধন্যবাদ। তাহলে শুরু করি’। উনি বসতে বসতে বললেন।
‘জি।’
‘আপনার একটা কবিতা আছে ভাষা নিয়ে।’
‘ভাষা নিয়ে? কোন কবিতাটা বলেন তো?’
‘কবিতাটা আপনি এখনো লেখেননি, তবে লিখবেন, হয়তো আজই। ইন ফ্যাক্ট, এই কবিতার ধারণাটা আপনি পেয়েছেন কিছুক্ষণ আগে, এক ধরনের তন্দ্রাবস্থার ভেতর।’
আমার হতবাক দৃষ্টি পুরোপুরি উপেক্ষা করে উনি বলে গেলেন, “এই কবিতা বলবে যে ভাষা গর্ভবতী হয় ও নানা অনুভূতির জন্ম দেয়। ‘বর্ণ’, ‘ধ্বনি’, ‘শব্দ’ এগুলোর কাজ হচ্ছে সেইসব অনুভূতিকে একেকটা খোপে ভরে একধরনের বাহ্য আকার দেওয়া। আদতে ভাষা একটা অন্তঃস্থ ব্যাপার। আপনি কি এরকম কিছুই বলতে চাচ্ছেন? মানে আমি কি আপনার ভাবনাগুলো ধরতে পারছি?’
‘হ্যাঁ…মানে…হয়তো পারছেন…কিন্তু আমি তো আসলে এখনো আমার ভাবনাগুলোকে গোছাতেই পারিনি। এই কিছুক্ষণ আগে আবছা স্বপ্নদৃশ্যের মতো কিছু জিনিস দেখলাম। বলতে পারেন কিছু পরাবাস্তব চিত্রকল্প ধরনের ব্যাপার। আপনি না এলে হয়তো এখন এই চিত্রকল্পগুলো নিয়েই ভাবতাম। তবে এটা নিয়ে কবিতা লিখতাম কিনা জানি না। কিন্তু আপনি কী করে…’
‘সেটা পরে বলছি। প্রথমেই দুঃখ প্রকাশ করছি আপনার ভাবনার সময়টাকে দখল করে নেওয়ার জন্য। কিন্তু না এসে আসলে উপায় ছিল না। আমি দীর্ঘদিন ধরে ভাষা নিয়ে কাজ করছি তাই বিষয়টা আমার কাছে ভীষণরকম গুরুত্বপূর্ণ।’
‘ও আচ্ছা তাই না-কি? বাহ! খুব ভালো। আসলে ভাষার প্রকৃতি ও গঠন নিয়ে আমারও যথেষ্ট আগ্রহ আছে। তবে আমি ভাষাকে শুধুই ব্যবহার করে যাবার পক্ষপাতী নই। এর নানা দিক নিয়ে পড়াশোনা ও লেখালেখি করতে চাই। কিন্তু আপনি হঠাৎ আমার কবিতার বিষয়বস্তু নিয়ে আগ্রহী হলেন কেন? বিশেষ করে যে কবিতাটা আমি এখনো লিখিইনি!’ আমি বললাম।
‘হঠাৎ ঠিক নয়। আমি অন্য অনেক কবির পাঠক হওয়ার পাশাপাশি আপনার কবিতারও একজন নিয়মিত পাঠক। আচ্ছা আপনি কি ভাষার এই গর্ভবতী হওয়ার ব্যাপারটায় সত্যিই বিশ্বাস করেন?’
‘দেখুন আমার সবসময় মনে হয়েছে যে ভাষা একটা সপ্রাণ ব্যাপার। এটা শুধুই শব্দ-বর্ণের পোশাকে ধরা কোনো আকার নয়। বরং এভাবে দেখলে ভাষাকে অনেকটাই খাটো করে দেখা হয়। যেন ভাষার শুধুই একটা ছেনাল শরীর আছে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য, মন বা আত্মা বলে কিছু নেই। আর আমরা লেখক-কবিরা ভাষার শরীরটারই বেসাতি করি শুধু। কিন্তু ব্যাপারটা একেবারেই সেরকম নয়। ভাষার সাথে যোগাযোগটা তো দ্বিপাক্ষিক। ভাষা না চাইলে আমি-আপনি হাজার চেষ্টা করেও একে আমাদের আয়ত্তে এনে ব্যবহার করতে পারব না।’
এরপর কিছুক্ষণের অস্বস্তিকর নীরবতা। ভদ্রলোকের মধ্যে একধরনের অস্থিরতা দেখা গেল। তিনি মনে মনে বিড়বিড় করছিলেন কিছু একটা।
‘আপনি চা-কফি কিছু খাবেন?’ আমি নীরবতা ভেঙে বলি।
‘উম্ম্…কফি, ব্ল্যাক।’ অন্যমনস্ক গলায় বললেন তিনি।
আমি কাজের ছেলেটাকে আমার জন্য চা আর ভদ্রলোকের জন্য কফি দিতে বললাম। আবারও কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। এরপর হঠাৎ-ই গলা খাঁকারি দিয়ে ভদ্রলোক বললেন,
‘আপনি নিশ্চয়ই সুইস ভাষাবিদ ফার্ডিন্যান্ড ডি সস্যুরের নাম শুনেছেন। বিশ শতকের এই প্রধান ভাষাবিদ বলেছেন যে ভাষা শুধুই ফর্ম, সাব্সটেন্স নয়। অর্থাৎ ভাষা আসলে একটা আকার মাত্র। বলা ও লেখার ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন সাইনের মাধ্যমে এই আকারটাকেই ধরার চেষ্টা করি মাত্র। এর ভেতরে আসলে কোনো পদার্থ নেই। উনি দাবার গুটির উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন…’
‘সস্যুরর এই তত্ত্বটা আমি জানি। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে নিজের আগ্রহে ভাষাবিজ্ঞানের কিছু কোর্স করেছিলাম। তবে এই তত্ত্বটা নিয়ে সস্যুরের সাথে আমার দ্বিমত আছে। আমি মনে করি সাব্সটেন্স ছাড়া ভাষার ফর্মটাই থাকে না। আর সে কারণেই ভাষা যদি শুধু ফর্ম হয়েও থাকে সাব্সটেন্স ছাড়া সেই ফর্ম মূল্যহীন। কাজেই ভাষার সাব্সটেন্সকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগই নেই।’
এই পর্যায়ে ভদ্রলোক বেশ রেগে গেলেন, ‘আপনাদের কবিদের নিয়ে এটাই হলো সবচেয়ে বড়ো সমস্যা! সবসময় আবেগতাড়িত হয়ে সবকিছু দেখতে চান আপনারা। বৈজ্ঞানিক একটা পর্যবেক্ষণকে কল্পনা আর আবেগ দিয়ে ঘেঁটে দিতে আপনাদের জুড়ি নেই’…, এটুকু বলে ঘড়ির দিকে তাকালেন তিনি।
এর মধ্যে চা-কফি এসে যায়।
‘আপনার এই কবিতাটা কি ছাপতেই হবে?’ কফিতে চুমুক দিয়ে বেশ অস্থিরভাবে বললেন ভদ্রলোক।
‘এখনো তো লিখিইনি…’
‘লিখুন কিন্তু ছাপাবেন না, প্লিজ। এটা আমার একটা বিনীত অনুরোধ। ডায়েরিতে লিখে রেখে দিন। একসময় হয়তো আপনারই আর ওটা ছাপাতে ইচ্ছে করবে না। তখন ছিঁড়ে ফেলে দেবেন। তা না হলে আপনার মৃত্যুর পরে সে ডায়েরি প্রকাশিত হয়ে যেতে পারে। আজকাল তো কিছুই লুকিয়ে রাখার উপায় নেই। যাই হোক, আপনার কবিতাটা প্রকাশিত হলে মানুষ বিভ্রান্ত হবে। ভাষা নিয়ে বহু বছরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও আবিষ্কার প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বছরের পর বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল মাঠে মারা যাবে।’
উনি কথা শেষ করে কফিতে দ্রুত কয়েকটা চুমুক দিয়ে উঠবার ভঙ্গি করলেন।
‘কিন্তু ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করা একজন মানুষ হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই এটা জানেন যে শুধু ভাষা-সম্পর্কিত জ্ঞান কেন, পৃথিবীর কোনো জ্ঞানই স্থির নয়। আগের আবিষ্কার বা চিন্তাকে প্রশ্ন করেই মানুষ এগিয়ে গেছে আর ভবিষ্যতেও তা-ই যাবে।’
ভদ্রলোককে হঠাৎই খুব বিমর্ষ মনে হলো। কফির কাপটা শব্দ করে পিরিচে রেখে উঠে পড়লেন এবার। অস্বাভাবিক দ্রুততার সাথে হাঁটতে শুরু করলেন বেরোনোর দরজাটার দিকে। আমি উনাকে এগিয়ে দেবার জন্য উঠতে উঠতে উনি দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন। আর আমি দরজা অবধি যেতে যেতে উনি পৌঁছে গেলেন সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ। আমি দরজায় দাঁড়িয়েই গলাটা খানিকটা চড়িয়ে বলি, ‘আপনার পরিচয়টা কিন্তু বললেন না, অন্তত নামটা…।’
সিঁড়ির শেষ মাথা থেকে ঠান্ডা ও বিষণœ গলায় উত্তর এলো, ‘সস্যুর। ফার্ডিন্যান্ড ডি সস্যুর।’



0 Comments